কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কর্মক্ষেত্রে আশীর্বাদ নাকি নতুন সংকট—এই বিতর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচিত। প্রযুক্তিবিষয়ক এক মতামতধর্মী নিবন্ধে লেখক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক কোরি ডক্টরো (Cory Doctorow) দাবি করেছেন, AI-এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করছে এটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
তার মতে, একই AI টুল ব্যবহার করেও কেউ আগের চেয়ে ভালো কাজ করতে পারছেন, আবার কেউ বাধ্য হচ্ছেন AI-এর তৈরি ভুল দ্রুত সংশোধন করতে। এই দুই বাস্তবতার পার্থক্যই এখন কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একই AI, ভিন্ন অভিজ্ঞতা
ডক্টরোর মতে, অনেক অভিজ্ঞ সফটওয়্যার ডেভেলপার AI ব্যবহার করে দ্রুত ও উন্নত মানের কোড লিখতে পারছেন।
অন্যদিকে, কিছু ডেভেলপার অভিযোগ করছেন, AI-এর তৈরি নিম্নমানের কোড ঠিক করতেই তাদের অধিকাংশ সময় ব্যয় হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে সফটওয়্যারের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
‘সেন্টর’ বনাম ‘রিভার্স সেন্টর’
এই পার্থক্য বোঝাতে লেখক দুটি ধারণা তুলে ধরেছেন—
সেন্টর (Centaur)
এখানে মানুষ AI-কে একটি সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেয় মানুষ, AI শুধু কাজকে দ্রুত ও সহজ করে।
এ ধরনের ব্যবহারে কর্মীর দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা—দুটিই বাড়তে পারে।
রিভার্স সেন্টর (Reverse Centaur)
এক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো। AI মূল কাজ করে, আর মানুষ শুধু তার ভুল খুঁজে বের করা, সংশোধন করা বা যাচাই করার দায়িত্ব পালন করে।
লেখকের ভাষায়, এতে কর্মীরা ধীরে ধীরে AI-এর সহকারী হয়ে পড়েন এবং ভুল হলে দায়ও শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরই বর্তায়।
AI নিয়ে মূল সমস্যা কোথায়?
ডক্টরোর মতে, সমস্যা AI প্রযুক্তিতে নয়; বরং অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে।
তার দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়াতে কর্মী কমিয়ে AI-এর ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। ফলে বাকি কর্মীদের কম সময়ে বেশি কাজ করতে হচ্ছে।
এতে কাজের চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি ভুলের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
AI কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, AI খাতে বিপুল বিনিয়োগ হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো প্রত্যাশিত লাভ করতে পারেনি।
লেখকের মতে, ভবিষ্যতে আয় বাড়ানোর জন্য কিছু কোম্পানি আরও বেশি কর্মী ছাঁটাই করে AI ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে পারে। যদিও এটি তার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ; এ বিষয়ে সব বিশেষজ্ঞ একমত নন।
কর্মীদের জন্য কী বার্তা?
ডক্টরোর মতে, AI সবচেয়ে কার্যকর তখনই, যখন এটি মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ AI যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে, মানুষের সহকারী হিসেবে কাজ করে। তিনি মনে করেন, কর্মীদের হাতে AI ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকলে প্রযুক্তির সুফল বেশি পাওয়া সম্ভব।
AI ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রকে কীভাবে বদলে দেবে, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন AI উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা—অতিরিক্ত নির্ভরতা কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
কোরি ডক্টরোর এই বিশ্লেষণ সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে AI-এর ভবিষ্যৎ প্রভাব নির্ভর করবে প্রযুক্তিটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের সঙ্গে কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, তার ওপর।

