অনলাইনে মাদকদ্রব্য বিক্রির অভিযোগে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। মামলায় দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
ডিএনসি জানিয়েছে, দারাজের প্ল্যাটফর্মে ‘সিবিডি অয়েল’ নামে বিক্রি হওয়া একটি পণ্যের নমুনা পরীক্ষায় গাঁজার সক্রিয় উপাদান টিএইচসি থাকার তথ্য পাওয়ার পর এ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহকারী আনিসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা
সোমবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর বাড্ডা থানায় মামলাটি দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এর আগে রোববার বিকেলে বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে আনিসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসির গোয়েন্দা শাখা।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীতে সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে মাদকদ্রব্যের অবৈধ কেনাবেচা, সরবরাহ, প্রচার বা লেনদেনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের দাবি, সংশোধিত আইনের আওতায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে এটিই প্রথম মামলা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮-এর সংশোধিত ধারার আওতায় সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্সের অবৈধ ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ, প্রস্তাব, প্রচার বা লেনদেনের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় তদন্ত
ডিএনসি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দারাজের ওয়েবসাইটে ‘সিবিডি অয়েল’ নামে একটি পণ্য বিক্রির তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কয়েকটি পণ্য অর্ডার করেন।
অর্ডার করা পণ্যগুলোর মধ্যে কয়েকটি সিবিডি অয়েল ডেলিভারি করা হয়। পরে নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে তাতে টিএইচসি—অর্থাৎ গাঁজার সক্রিয় উপাদান—থাকার তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করেছে ডিএনসি।
এরপরই সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহকারী ও উৎপাদনস্থল শনাক্ত করতে অভিযান চালানো হয়।
সাঁতারকুলে ‘কারখানায়’ অভিযান
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা অঞ্চলের উপপরিচালক মেহেদী হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, পণ্যে মাদকদ্রব্যের উপাদান পাওয়ার পর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়।
ডিএনসির দাবি, ওই ফ্ল্যাটে বিপুল পরিমাণ সিবিডি অয়েল এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যায়। সেখান থেকেই পণ্যটির সরবরাহকারী ও কথিত উৎপাদনকারী আনিসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও দাবি করেছেন, আনিসুর রহমান দীর্ঘদিন জাপানে ছিলেন। সেখানে তিনি গাঁজার তরল উপাদান ব্যবহার করে তেল তৈরির একটি পদ্ধতি শেখেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে দেশে ফিরে সুগন্ধি সাবান তৈরির আড়ালে তিনি কথিতভাবে এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা দারাজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
দারাজের প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়া পণ্য নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনায় মূল প্রশ্ন উঠেছে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রি হওয়া পণ্যের যাচাই ও নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিপুলসংখ্যক তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতা পণ্য তালিকাভুক্ত করায় প্রতিটি পণ্যের উপাদান ও বৈধতা যাচাই করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য, সাপ্লিমেন্ট, কসমেটিকস কিংবা রাসায়নিক উপাদানযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে পণ্যের লেবেল, উপাদান, অনুমোদন এবং বিক্রেতার বৈধতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানিয়েছেন, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। দারাজের পাশাপাশি সন্দেহজনক অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মও নজরদারির আওতায় রয়েছে বলে তিনি জানান।
সামনে বড় প্রশ্ন প্ল্যাটফর্মের দায় নিয়ে
দারাজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এই মামলা শুধু একটি পণ্য বা একজন বিক্রেতাকে ঘিরে নয়; বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত ই-কমার্স খাতে অনলাইন মার্কেটপ্লেসের দায় ও জবাবদিহি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে।
একটি মার্কেটপ্লেসে কোনো তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতা বেআইনি পণ্য তালিকাভুক্ত করলে প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব কোথায় শেষ হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ আইনি দায়ের মুখোমুখি হবে—এ ধরনের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে এই মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায়।
মামলার তদন্ত এগিয়ে গেলে পণ্যটি কীভাবে প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হয়েছিল, বিক্রেতার তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং অভিযোগ পাওয়ার পর প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনলাইন মাধ্যমে মাদক বিক্রি বা সরবরাহ ঠেকাতে তাদের নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।

