বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো শিক্ষার্থীদের গণিত ও বিজ্ঞানভীতি দূর করা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের অভাবে এই দুই বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে। কোভিড-১৯ মহামারীর পর সেই বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। এই বাস্তবতায় দেশের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে সহজ, আনন্দময় ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
মাউশির অনুমোদনে এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ‘ডিজিটাল গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্প’-এর প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সফল হলে এই মডেল ধাপে ধাপে দেশের সব জেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। কেন প্রয়োজন এই প্রকল্প? দেশের অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এখনও গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট কিংবা নিয়মিত অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী শুরু থেকেই এই দুটি বিষয়কে কঠিন মনে করে এবং পরীক্ষামুখী মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর খান মাইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আমাদের সময়কে বলেন, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত শিখনসামগ্রী ও দক্ষ পাঠদানের অভাবে কাক্সিক্ষত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। কোভিড-পরবর্তী সময়ে শহর ও গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান আরও বেড়েছে। এই প্রকল্প সেই ব্যবধান কমানোর একটি কার্যকর উদ্যোগ।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল শিখন পদ্ধতির উদ্দেশ্য শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষককে আরও দক্ষ করে তোলা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ডিজিটাল টিচিং গাইড ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ব্যবহার করে পাঠদান করবেন। এরপর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আলোচনা, দলীয় কাজ, সমস্যা সমাধান এবং হাতে-কলমে শেখার
কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ফলে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিশ্লেষণী ও প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে। মাউশির মহাপরিচালক বলেন, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, দক্ষ শিক্ষক ছাড়া শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তন সম্ভব নয়। ডিজিটাল টিচিং গাইড শিক্ষকদের পাঠদান সক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বাড়াবে।
কী থাকবে এই ডিজিটাল ব্যবস্থায়? প্রকল্পের আওতায় একটি আধুনিক লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) তৈরি করা হবে, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকবেন।
এই প্ল্যাটফর্মে থাকবে পাঠ্যবইভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট; ভিডিও লেকচার ও মাল্টিমিডিয়া পাঠ; অনুশীলনী ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা; শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ; অভিভাবকের জন্য উপস্থিতি ও ফলাফল দেখার সুবিধা; শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল টিচিং গাইড।
মাউশি জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্য রেখে সব কনটেন্ট তৈরি করা হবে। চাঁদপুর থেকে শুরু হলেও এর লক্ষ্য ৬৪ জেলা। গত ২৪ ও ২৫ জুলাই চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার বাজাপ্তী রমণী মোহন উচ্চ বিদ্যালয় এবং গন্ডামারা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণির প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থী সরাসরি অংশ নেবে। তাদের অভিজ্ঞতা, শিক্ষকদের মতামত এবং বিদ্যালয়ের বাস্তব সক্ষমতা মূল্যায়নের পর পুরো চাঁদপুর জেলাকে পাইলট এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পরে ধাপে ধাপে দেশের ৬৪টি জেলায় এই মডেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
জাপান-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ : ‘ডিজিটাল ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্স এডুকেশন প্রজেক্ট ফর টিচারস অ্যান্ড স্টুডেন্টস ইন আন্ডার-রিসোর্সড রিমোট এরিয়াস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে জাইকার গ্রাসরুটস টেকনিক্যাল কো-অপারেশন কর্মসূচির আওতায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জাপানের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ই-এডুকেশন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন এবং মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা করছে দেশের শিক্ষাপ্রযুক্তি (এডটেক) বিষয়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাকবন লিমিটেড।
জানা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশেই গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিঙ্গাপুরে ডিজিটাল সিমুলেশন, ভার্চুয়াল ল্যাব এবং সমস্যা-ভিত্তিক শিক্ষা গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষার্থীরা শুধু সূত্র মুখস্থ করে না, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে শেখে।
জাপানে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও শিক্ষকই শেখার মূল চালিকাশক্তি। ডিজিটাল কনটেন্ট শিক্ষককে সহায়তা করে, কিন্তু পাঠ পরিচালনা করেন শিক্ষকই। বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগেও একই দর্শন অনুসরণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ আমাদের সময়কে বলেন, শুধু ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করলেই শিক্ষার মান বদলে যাবে না। প্রকল্প সফল করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত ডিভাইস এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, এই প্রকল্প নিয়মিত মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিচালিত হলে শহর-গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমবে, গণিত ও বিজ্ঞানভীতি দূর হবে এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

