স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও এখন খুব সহজেই এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর সুযোগ নিয়ে অনেক সময় সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতিশোধ কিংবা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়।
বিশেষ করে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সাবেক সঙ্গীর কাছে থাকা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ভয় দেখানো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে ভুক্তভোগীকে মানসিক চাপের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক নানা সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে নীরব থাকার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি কিংবা অনুমতি ছাড়া তা ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ছবি প্রকাশের হুমকি কি অপরাধ?
কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তাঁর অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা, অন্যের কাছে পাঠানো কিংবা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইল করা পরিস্থিতিভেদে সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন আইনি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
বিশেষ করে ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে কাউকে ভয় দেখানো, যৌন হয়রানি করা, রিভেঞ্জ পর্নের হুমকি দেওয়া, সেক্সটরশন বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর উচিত হুমকিকে হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা।
প্রথমেই যা করবেন
ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি পেলে প্রথম কাজ হলো আতঙ্কিত হয়ে সবকিছু মুছে ফেলা নয়। বরং ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ করা।
যেসব বিষয় সংরক্ষণ করা জরুরি—
- হুমকি দেওয়া মেসেজের স্ক্রিনশট
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ফোন নম্বর বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি
- মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য অ্যাপের কথোপকথনের তথ্য
- ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট পোস্ট বা প্রোফাইলের লিংক
- ভয় দেখানোর অডিও বা ভিডিও
- টাকা দাবি করা হলে সেই সংক্রান্ত তথ্য
- ঘটনার তারিখ ও সময়ের বিস্তারিত তথ্য
প্রয়োজনে এসব তথ্য একাধিক নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
ছবি প্রকাশ হয়ে গেলে কী করবেন?
কোনো ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে গেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে কনটেন্টটি রিপোর্ট করতে পারেন।
একই সঙ্গে পোস্টের লিংক, অ্যাকাউন্টের নাম, স্ক্রিনশট এবং অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা জরুরি। শুধু পোস্টটি ডিলিট করে দেওয়ার চেষ্টা করলে পরবর্তী সময়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে।
তবে ছবি বা ভিডিও অন্যদের কাছে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে প্রয়োজনীয় প্রমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে দেওয়াই নিরাপদ।
কোথায় অভিযোগ করবেন?
ভুক্তভোগী নিকটস্থ থানায় গিয়ে অভিযোগ বা মামলা করার বিষয়ে পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন। সাইবার অপরাধের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সাইবার ইউনিটেও যোগাযোগ করা যায়।
নারী ভুক্তভোগীদের জন্য পুলিশের সংশ্লিষ্ট নারী সহায়তা ও সাইবার অপরাধবিষয়ক সেবাগুলো থেকেও সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঘটনার ধরন অনুযায়ী আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতের মাধ্যমেও প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।
এআই দিয়ে ভুয়া ছবি বানালেও কি ব্যবস্থা নেওয়া যায়?
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে এখন বাস্তব ছবিকে পরিবর্তন করে কিংবা এআই ব্যবহার করে ভুয়া ও আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
কারও মুখ বা ছবি ব্যবহার করে এমন ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করে তাকে অপমান, হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল বা ভয় দেখানো হলে বিষয়টি গুরুতর আইনি সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
তাই ভুয়া ছবি বা ভিডিও দেখলে সেটি সত্য ধরে নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।
বন্ধু বা সাবেক সঙ্গীকে দেওয়া ছবি কি প্রকাশ করা যাবে?
কাউকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো ছবি পাঠানো মানেই সেই ছবি প্রকাশ বা অন্যের কাছে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া নয়।
একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করে তাঁর সঙ্গী, বন্ধু বা পরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত ছবি পাঠাতে পারেন। সেই ছবি পরবর্তীতে তাঁর অনুমতি ছাড়া অন্যদের কাছে পাঠানো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনি দায় তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া বা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
ভুক্তভোগীকে দোষারোপ নয়
ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের ঘটনায় অনেক সময় সমাজে উল্টো ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়—কেন তিনি ছবি তুলেছিলেন, কেন কাউকে পাঠিয়েছিলেন বা কেন এমন ছবি ফোনে রেখেছিলেন।
কিন্তু কারও ব্যক্তিগত ছবি অন্যের কাছে থাকা আর সেটি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করার অধিকার থাকা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঘটনার পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ড বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে কীভাবে সতর্ক থাকবেন?
ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহারে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো—
১. অত্যন্ত ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে সংরক্ষণ বা শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
২. ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্লাউড অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড এবং দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবহার করুন।
৩. কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করলে সেটি ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার হতে পারে, তা বিবেচনা করুন।
৪. সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা বা অপরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৫. কেউ ছবি প্রকাশের হুমকি দিলে টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরামর্শ নিন।
৬. হুমকি বা হয়রানির প্রমাণ মুছে ফেলবেন না।
শেষ কথা
ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও নিয়ে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপের কারণে নীরব থাকা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। দ্রুত প্রমাণ সংরক্ষণ, অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া শুধু সামাজিকভাবে ক্ষতিকর নয়—ঘটনার ধরন অনুযায়ী এর জন্য আইনি দায়ও তৈরি হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেমন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জরুরি, তেমনি অন্যের গোপনীয়তার প্রতিও সম্মান দেখানো প্রয়োজন।

