বাংলাদেশে এক দশকের বেশি সময় ধরে অনলাইন খাবার ও গ্রোসারি সরবরাহ সেবা দিয়ে আসছে ফুডপান্ডা। প্রতিদিন হাজার হাজার অর্ডার ডেলিভারি করলেও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাজারে লাভের মুখ দেখেনি। বরং দীর্ঘ এই সময়ে তাদের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১১ মিলিয়ন ইউরোর বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা।
জার্মানভিত্তিক মূল প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি হিরো-এর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
চার প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত লোকসান
বাংলাদেশে ফুডপান্ডার কার্যক্রম পরিচালিত হয় চারটি পৃথক সত্তার মাধ্যমে। এগুলো হলো মূল ফুড ডেলিভারি ব্যবসা, পান্ডামার্ট, ডিএইচ কিচেনস (DH Kitchens) এবং জেড ১৩৪৩ জিএমবিএইচ অ্যান্ড কো ভিয়ের্টে ভারভালটুংস কেজি নামের একটি হোল্ডিং কোম্পানি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই চারটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট ১১০.৬৬ মিলিয়ন ইউরো লোকসান করেছে। এই সময়ের মধ্যে কোনো অর্থবছরেই তারা মুনাফা অর্জন করতে পারেনি।
সবচেয়ে বেশি লোকসান মূল ফুড ডেলিভারি ব্যবসায়
লোকসানের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে মূল ফুড ডেলিভারি বিভাগ থেকে। এ খাতের মোট লোকসান ৭৯.২২ মিলিয়ন ইউরো। শুধু গত বছরই এই বিভাগের লোকসান ৬৫ শতাংশ বেড়ে ৭.১৪ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছায়, যা গ্রুপের মোট লোকসানের ৬০ শতাংশেরও বেশি।
পান্ডামার্টেও বাড়ছে লোকসান
গ্রোসারি ডেলিভারি সেবা পান্ডামার্ট ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই লোকসানে রয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে ২.২৭ মিলিয়ন ইউরো, যা প্রায় ৩১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আর শুরু থেকে এ পর্যন্ত পান্ডামার্টের মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২০.২৭ মিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ২৮৪ কোটি টাকা।
কিছুটা কমেছে ডিএইচ কিচেনসের ক্ষতি
ফুডপান্ডার ক্লাউড কিচেন বিভাগ ডিএইচ কিচেনস গত বছরে আগের বছরের তুলনায় লোকসান কিছুটা কমাতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল ০.৩৪ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তবে ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই বিভাগের মোট লোকসান ২.২৮ মিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে।
হোল্ডিং কোম্পানিও লোকসানে
ফুডপান্ডার হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান জেড ১৩৪৩-ও টানা লোকসানে রয়েছে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ২.০১ মিলিয়ন ইউরো লোকসান করেছে। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তাদের মোট লোকসানের পরিমাণ ৮.৮৯ মিলিয়ন ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৪ কোটি টাকা।
কেন টানা লোকসান?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অনলাইন ডেলিভারি বাজার দ্রুত বিস্তৃত হলেও পরিচালন ব্যয়, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক পরিচালনার খরচ, মূল্যছাড়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং গ্রাহক ধরে রাখতে উচ্চ বিনিয়োগের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো লাভজনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি।
উবারের অধিগ্রহণ প্রস্তাব
সম্প্রতি উবার ডেলিভারি হিরো অধিগ্রহণের জন্য ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে। উবারের পরিকল্পনা হলো, যেসব বাজারে তাদের রাইড-শেয়ারিং সেবা রয়েছে কিন্তু খাবার সরবরাহ সেবা নেই, সেখানে ডেলিভারি হিরোর ব্যবসাকে কাজে লাগিয়ে গ্রাহকদের কাছে আরও বিস্তৃত সেবা পৌঁছে দেওয়া।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, একই গ্রাহক যদি একাধিক সেবা ব্যবহার করেন, তাহলে ব্যবসার আয় ও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশের বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা
তবে বাংলাদেশের বাজারকে এখনো লাভজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। উল্লেখ্য, উবার নিজেই ২০২০ সালের জুন মাসে, মাত্র ১৪ মাসের কার্যক্রমের পর দেশের ফুড ডেলিভারি ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সাবেক সভাপতি এ কে এম ফাহিম মাশরুর মনে করেন, ডেলিভারি হিরো অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের ফুডপান্ডা ব্যবসায় দুটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একটি হলো, উবার বর্তমান ফুডপান্ডা ব্র্যান্ডটি বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা করবে। অন্যটি হলো, ব্র্যান্ডটি ধীরে ধীরে বন্ধ করে নতুন কৌশলে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
তিনি বলেন, যেহেতু বাংলাদেশের বাজার এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে লাভজনক নয়, তাই ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

