স্মার্টফোনের ক্যামেরা এতদিন ছবি ও ভিডিও ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার সেই ধারণাকেই যেন বদলে দিতে চাইছে HONOR। এমন এক ফোনের ধারণা সামনে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি, যার ক্যামেরা ফোনের বডির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে নড়াচড়া করতে পারে, ব্যবহারকারীকে অনুসরণ করতে পারে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আরও স্বাভাবিকভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
HONOR Robot Phone নামের এই নতুন ধরনের স্মার্টফোনটি MWC 2026-এ শোকেস করা হয়েছে। HONOR-এর ভাষায় এটি শুধু আরেকটি স্মার্টফোন নয়; বরং AI, রোবোটিক মুভমেন্ট ও উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তিকে একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা একটি নতুন ধরনের ‘embodied AI’ ডিভাইস।
ফোনের বডি থেকে বেরিয়ে আসবে ক্যামেরা
Robot Phone-এর সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় এর রোবোটিক ক্যামেরা ব্যবস্থা। ফোনের পেছনের অংশে থাকা ক্যামেরা মেকানিজম প্রয়োজন অনুযায়ী বডির বাইরে উঠে এসে ফোনের ওপরের দিকে অবস্থান নিতে পারে।
এরপর ক্যামেরাটি বিভিন্ন দিকে ঘুরে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সাধারণ স্মার্টফোনের স্থির ক্যামেরার বদলে এটি অনেকটা ছোট একটি রোবোটিক ক্যামেরার মতো আচরণ করে।
HONOR বলছে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফোনটি শুধু ছবি তোলার যন্ত্র হিসেবে কাজ করবে না; বরং পরিবেশ বুঝে নিজের ক্যামেরার দৃষ্টিকোণও পরিবর্তন করতে পারবে।
ক্যামেরা নিজেই আপনাকে অনুসরণ করবে
ধরা যাক, ফোনটি কোথাও রেখে আপনি ভিডিও করছেন। সাধারণ ফোনে ফ্রেমের বাইরে চলে গেলে ক্যামেরার সামনে আবার ফিরে আসতে হয়। Robot Phone-এর ক্ষেত্রে AI Object Tracking প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যামেরা ব্যবহারকারীর গতিবিধি অনুসরণ করতে পারে।
অর্থাৎ আপনি একদিকে হাঁটছেন, ঘুরছেন কিংবা ক্যামেরার সামনে অবস্থান পরিবর্তন করছেন—রোবোটিক ক্যামেরা সেই অনুযায়ী নিজের অবস্থান সামঞ্জস্য করে আপনাকে ফ্রেমে রাখার চেষ্টা করবে।
HONOR-এর দাবি অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি বিশেষ করে ভিডিও কল, ভ্লগিং, কনটেন্ট তৈরি এবং হ্যান্ডস-ফ্রি ভিডিও ধারণে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
শুধু নড়বে না, ‘অভিব্যক্তিও’ দেখাবে
Robot Phone-এর আরেকটি অভিনব দিক হলো এর শারীরিক মুভমেন্ট। HONOR এটিকে ‘embodied AI interaction’ হিসেবে তুলে ধরছে।
অর্থাৎ AI-এর প্রতিক্রিয়া শুধু স্ক্রিনে লেখা বা কণ্ঠস্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ফোনের রোবোটিক অংশের নড়াচড়ার মাধ্যমেও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা সম্ভব হবে।
HONOR-এর প্রদর্শনীতে Robot Phone-কে মাথা নাড়ার মতো মুভমেন্ট, নাচ এবং বিভিন্ন ধরনের অভিব্যক্তিমূলক অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো ফোনকে একটি স্থির ডিভাইসের বদলে আরও প্রাণবন্ত ও ইন্টার্যাকটিভ সহচরে পরিণত করা।
ফোনের ক্যামেরায় 4DoF গিম্বল
এত ছোট একটি স্মার্টফোনের ভেতরে রোবোটিক মুভমেন্ট তৈরি করা সহজ নয়। এ কারণে HONOR ক্যামেরা মেকানিজমের জন্য একটি ক্ষুদ্র 4DoF গিম্বল সিস্টেম ব্যবহার করেছে।
HONOR-এর তথ্য অনুযায়ী, এর মাইক্রো মোটরের আকার প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় রোবোটিক মেকানিজমকে ফোনের ভেতরের সীমিত জায়গায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
ক্যামেরা সিস্টেমে রয়েছে তিন-অক্ষের গিম্বল স্ট্যাবিলাইজেশন। ফলে ক্যামেরার মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভিডিও ধারণের সময় স্থিরতাও বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
২০০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা
রোবোটিক মুভমেন্টের পাশাপাশি ক্যামেরা হার্ডওয়্যারেও জোর দিয়েছে HONOR।
Robot Phone-এ ২০০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা সেন্সর এবং গিম্বল-ভিত্তিক স্ট্যাবিলাইজেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে আরও দুটি ক্যামেরা সেন্সর রয়েছে, যার মধ্যে রোবোটিক মেকানিজমের সঙ্গে যুক্ত ক্যামেরাটি প্রয়োজন অনুযায়ী ফোনের বডির বাইরে বেরিয়ে আসে।
অর্থাৎ এখানে শুধু বেশি মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা দেওয়াই লক্ষ্য নয়; ক্যামেরাকে শারীরিকভাবে নড়াচড়া করিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণের নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য।
ভিডিওতে আসছে Super Steady ও SpinShot
ভিডিও কনটেন্ট নির্মাতাদের কথা মাথায় রেখেও বেশ কিছু প্রযুক্তি যুক্ত করেছে HONOR।
Super Steady Video মোড দ্রুতগতির বা নড়াচড়ার পরিস্থিতিতে ভিডিওকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কাজ করবে। ফলে হাঁটা, চলন্ত পরিবেশ কিংবা অন্যান্য গতিশীল পরিস্থিতিতেও তুলনামূলক স্মুথ ভিডিও ধারণের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে AI SpinShot ব্যবহার করে ক্যামেরাকে ৯০ বা ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরিয়ে সিনেমাটিক ধরনের শট তৈরি করা যাবে। অর্থাৎ ক্যামেরার ঘূর্ণনও ভিডিও তৈরির একটি সৃজনশীল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
AI দিয়ে শুধু ছবি নয়, ভিডিও কলও হবে স্মার্ট
Robot Phone-এর ধারণাটি শুধু ফটোগ্রাফির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
HONOR-এর তথ্যমতে, এতে এমন AI ইন্টার্যাকশন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ফোন ব্যবহারকারীর গতিবিধি ও আশপাশের পরিস্থিতি বুঝতে পারে। বিশেষ করে ভিডিও কলের সময় ক্যামেরা ব্যবহারকারীকে অনুসরণ করে ফ্রেমে রাখার মতো কাজ করতে পারবে।
এতে ভিডিও কলের অভিজ্ঞতা অনেকটা এমন হতে পারে, যেন আপনার সামনে একজন ক্যামেরাম্যান দাঁড়িয়ে আছে এবং আপনি যেখানে যাচ্ছেন, ক্যামেরাও সেভাবেই আপনার দিকে ঘুরছে।
স্মার্টফোন নাকি পকেটের রোবট?
HONOR Robot Phone-এর সবচেয়ে বড় বিষয় সম্ভবত এর প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন নয়, বরং স্মার্টফোন সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা।
এতদিন স্মার্টফোনকে একটি স্থির ডিভাইস হিসেবে দেখা হয়েছে—স্ক্রিন থাকবে, ক্যামেরা থাকবে, ব্যবহারকারী নির্দেশ দিলে ফোন কাজ করবে। Robot Phone সেই কাঠামোর বাইরে গিয়ে ফোনকে এমন একটি ডিভাইসে পরিণত করতে চাইছে, যা নিজেও নড়াচড়া করবে এবং পরিবেশের সঙ্গে শারীরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
HONOR এটিকে তাদের ‘Augmented Human Intelligence’ বা AHI ধারণার অংশ হিসেবে দেখছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য AI-কে শুধু সফটওয়্যারের মধ্যে না রেখে ডিভাইসের শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত করা।
ক্যামেরা যখন আপনার ‘ব্যক্তিগত ক্যামেরাম্যান’
এই প্রযুক্তি বাস্তবে বাণিজ্যিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভ্লগার, শর্ট ভিডিও নির্মাতা, ভিডিও কল ব্যবহারকারী কিংবা যারা একা কনটেন্ট তৈরি করেন—তাদের জন্য এটি বেশ কার্যকর হতে পারে।
একটি ফোন ট্রাইপডে রেখে নিজে সামনে হাঁটছেন, কথা বলছেন বা কোনো কাজ করছেন—ক্যামেরা যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে অনুসরণ করে, তাহলে আলাদা ক্যামেরাম্যান বা জটিল ট্র্যাকিং সেটআপের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে।
তবে সামনে রয়েছে বড় কিছু চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তিটি যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তব ব্যবহারে চ্যালেঞ্জও ততটাই।
প্রথম প্রশ্ন হলো স্থায়িত্ব। ফোনের ক্যামেরা যদি নিয়মিত বডির ভেতর থেকে বের হয় এবং আবার ঢোকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মোটর, গিম্বল ও মেকানিক্যাল অংশ কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে—তা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিষয় হলো ব্যাটারি খরচ। ক্যামেরার সেন্সর, মোটর, AI প্রসেসিং ও অবজেক্ট ট্র্যাকিং একসঙ্গে চললে সাধারণ স্মার্টফোন ক্যামেরার তুলনায় শক্তি খরচ বাড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা। এমন একটি ক্যামেরা যা নিজে নড়তে পারে এবং ব্যবহারকারীর গতিবিধি অনুসরণ করতে পারে, সেটির ক্যামেরা কখন সক্রিয় হচ্ছে এবং কীভাবে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ করছে—এগুলো ভবিষ্যতে ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
কবে বাজারে আসবে?
HONOR MWC 2026-এ Robot Phone-কে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ হিসেবে সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল উপস্থাপনায় এটিকে একটি নতুন ধরনের স্মার্টফোন হিসেবে দেখানো হলেও, বিস্তারিত বাণিজ্যিক মূল্য ও সব বাজারে বিক্রির তথ্য এখনও সীমিত।
ফলে বাংলাদেশ বা ভারতের বাজারে ফোনটি কবে এবং কী দামে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের জন্য HONOR-এর পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
স্মার্টফোনের পরবর্তী ধাপ কি এমনই হবে?
HONOR Robot Phone হয়তো এখনই সবার হাতে পৌঁছে যাবে না। কিন্তু এটি স্মার্টফোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—আগামী দিনের ফোন কি শুধু আমাদের নির্দেশ মেনে কাজ করবে, নাকি নিজেরাও পরিবেশ বুঝে নড়াচড়া করবে এবং আমাদের সঙ্গে আরও স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করবে?
HONOR-এর Robot Phone সেই ভবিষ্যতেরই একটি নমুনা। স্ক্রিনের ভেতর থাকা AI-কে যখন ফোনের শরীরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন একটি সাধারণ স্মার্টফোন ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে পারে একটি চলমান, প্রতিক্রিয়াশীল ও ব্যক্তিগত AI সহচর।
আর সেখানেই Robot Phone-এর সবচেয়ে বড় চমক—এটি শুধু ‘আরও একটি স্মার্টফোন’ নয়, বরং স্মার্টফোন কী হতে পারে, সেই ধারণাটিই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

