একটি মৃত সংবাদমাধ্যমকে আবার জীবিত করা হলো। নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া এনজিও ফিরে এলো নতুন পরিচয়ে। এমনকি কয়েক বছর আগে মারা যাওয়া একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের নামও দেখা গেল জাতিসংঘের একটি অনুষ্ঠানে।
এগুলো কোনো রাজনৈতিক থ্রিলারের গল্প নয়। বরং ইউরোপভিত্তিক গবেষণা সংস্থা EU DisinfoLab-এর ২০২০ সালের একটি অনুসন্ধানে উঠে আসা চিত্র।
সংস্থাটির দাবি, ‘Indian Chronicles’ নামে তারা যে প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে, সেটি প্রায় ১৫ বছর ধরে—২০০৫ সাল থেকে—চলছিল। এর সঙ্গে ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন, ভুয়া বা পুনরুজ্জীবিত মিডিয়া, এনজিও, থিংকট্যাংক এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক যুক্ত ছিল বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়।
EU DisinfoLab-এর ভাষ্য অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং বিশেষ করে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। চীনও এই প্রচারণার একটি গৌণ লক্ষ্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এগুলো EU DisinfoLab-এর অনুসন্ধানের ফলাফল ও অভিযোগ; ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তি এই কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী—এমন সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদন থেকে টানা যায় না।
১৫ বছরের ‘অপারেশন’, ৭৫০-এর বেশি ভুয়া মিডিয়া
EU DisinfoLab-এর তদন্তে যে সংখ্যাগুলো সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে, তার একটি হলো ভুয়া বা সন্দেহজনক মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল—
- ১১৯টি দেশে ৭৫০টির বেশি ভুয়া মিডিয়া আউটলেট
- ৫৫০টির বেশি ডোমেইন
- জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে স্বীকৃত বা অনুমোদিত ১০টির বেশি এনজিও
- ইউরোপ ও জাতিসংঘকে ঘিরে বিভিন্ন থিংকট্যাংক ও সংগঠন
- ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম
তদন্তকারীদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান ও ওয়েবসাইটের একটি বড় অংশের উদ্দেশ্য ছিল একই ধরনের বার্তা বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া।
বিশেষ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কনটেন্ট তৈরি ও পুনঃপ্রচার ছিল এই নেটওয়ার্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে দাবি করা হয়েছে।
‘মৃত’ এনজিওর পুনর্জন্ম
তদন্তের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশগুলোর একটি হলো পুরোনো ও নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ।
EU DisinfoLab বিশেষভাবে Commission to Study the Organization of Peace (CSOP)-এর কথা উল্লেখ করেছে।
তদন্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। পরে ২০০৫ সালে সেটিকে আবার সক্রিয় করা হয় বলে দাবি করে EU DisinfoLab।
আর এখানেই তদন্তকারীরা আরও অস্বাভাবিক একটি বিষয় দেখতে পান।
CSOP-এর সাবেক চেয়ারম্যান এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব Professor Louis B. Sohn ২০০৬ সালে মারা যান। কিন্তু EU DisinfoLab-এর অনুসন্ধানে এমন নথি ও অনলাইন তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে, যেখানে তাঁর নামকে ২০০৭ সালের একটি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সভা এবং ২০১১ সালের ওয়াশিংটনের একটি অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, তদন্তকারীদের ভাষায়, শুধু একটি মৃত প্রতিষ্ঠানই নয়—একজন মৃত ব্যক্তির পরিচয়ও পরবর্তী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে তারা মনে করে।
জাতিসংঘে কীভাবে প্রবেশ?
অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো।
EU DisinfoLab-এর দাবি, অন্তত ১০টি জাতিসংঘ-স্বীকৃত এনজিওকে তারা একই প্রভাব নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এনজিওর কিছু আগে থেকেই অস্তিত্বহীন বা নিষ্ক্রিয় ছিল এবং পরে নতুন উদ্দেশ্যে পুনরুজ্জীবিত হয়।
এর মাধ্যমে জাতিসংঘের বিভিন্ন সভা, মানবাধিকার কাউন্সিলের সাইড ইভেন্ট এবং সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ তৈরি করা হতো বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে EU DisinfoLab যেসব সংগঠনের নাম উল্লেখ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে—
European Organization for Pakistani Minorities (EOPM), Baluchistan House এবং South Asia Democratic Forum (SADF)।
তদন্তকারীদের দাবি, জেনেভায় এসব সংগঠন লবিং, বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও জাতিসংঘের সাইড ইভেন্টে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পাকিস্তানবিরোধী বক্তব্য তুলে ধরত।

মানবাধিকার ইস্যু কি ছিল ‘প্রবেশদ্বার’?
EU DisinfoLab-এর তদন্তের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ হলো—প্রভাব বিস্তারের জন্য সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারণার বদলে বিভিন্ন মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু ইস্যুকে ব্যবহার করা হতো বলে তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের এসব ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করা হতো। পরে তাদের বক্তব্য বা সফরকে বিভিন্ন মিডিয়া ও সংগঠনের মাধ্যমে ভারতের পক্ষে ইতিবাচক এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বয়ানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষায়, এতে একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের মরীচিকা’ তৈরি হতে পারে—যেখানে কয়েকজন ইউরোপীয় এমইপির ব্যক্তিগত বক্তব্য বা অংশগ্রহণকে বৃহত্তর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের ঘিরে ‘হানিপট’
ব্রাসেলসেও নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান চালায় EU DisinfoLab।
তাদের দাবি, “EP Today”-এর মতো ওয়েবসাইট ইউরোপীয় রাজনীতি ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের খবরের ওয়েবসাইট হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করত। কিন্তু তদন্তকারীদের মতে, এসব প্ল্যাটফর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান সামনে আনা।
পরবর্তী সময়ে EU DisinfoLab “EU Chronicle” নামে আরেকটি প্ল্যাটফর্মকে একই ধরনের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে।
তদন্ত অনুযায়ী, ছয় মাসেরও কম সময়ে EU Chronicle-এ অন্তত ১১ জন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য মতামত বা নিবন্ধ লিখেছেন অথবা সমর্থন করেছেন।
এখানেই তৈরি হয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—একটি ওয়েবসাইট যদি নিজেকে স্বাধীন ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নিতে কাজ করে, তাহলে সেটিকে ব্যবহারকারী রাজনীতিকরা কি এর প্রকৃত পরিচয় জানতেন?
EU DisinfoLab-এর অনুসন্ধান সেই প্রশ্নেরই একটি দিক তুলে ধরে।
আসল ‘অ্যাম্পলিফায়ার’ কে?
একটি প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্কের শক্তি শুধু কনটেন্ট তৈরিতে নয়; সেটি কত দ্রুত এবং কত বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটিই বড় বিষয়।
এই জায়গায় EU DisinfoLab-এর তদন্তে উঠে আসে ভারতের সংবাদ সংস্থা ANI—Asian News International-এর নাম।
EU DisinfoLab-এর দাবি, ব্রাসেলস ও জেনেভায় তৈরি হওয়া বিভিন্ন কনটেন্টকে ANI পুনরায় প্রকাশ বা পুনঃপ্যাকেজ করত। অনেক ক্ষেত্রে এসব লেখা ‘স্বাধীন ইউরোপীয় মিডিয়া’র প্রতিবেদন হিসেবে উপস্থাপিত হতো বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।
এরপর সেই কনটেন্ট আরও বড় একটি নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ত।
তদন্তকারীরা এমন একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেন, যেখানে ৯৫টি দেশে ৫০০টির বেশি স্থানীয় মিডিয়া ওয়েবসাইট ছিল।
ফলে একটি নির্দিষ্ট বক্তব্য—
NGO → ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্ম → ANI → স্থানীয় মিডিয়া → বহু ওয়েবসাইট
এই ধরনের চক্রের মাধ্যমে বারবার প্রচারিত হতে পারত।
একই খবর শত শত ওয়েবসাইটে: ‘ইকো চেম্বার’ তৈরি
ডিজিটাল যুগের ডিসইনফরমেশনের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হলো একই তথ্যকে অসংখ্য স্বাধীন উৎসের খবর হিসেবে দেখানো।
একটি ঘটনা যদি ১০টি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়, পাঠকের কাছে সেটি ১০টি পৃথক সূত্রের তথ্য বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু যদি ওই ১০টি ওয়েবসাইটের পেছনে একই নেটওয়ার্ক থাকে, তাহলে তৈরি হয় একটি ইকো চেম্বার—একই বক্তব্য বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
EU DisinfoLab-এর তদন্তে দাবি করা হয়েছে, Indian Chronicles-এর নেটওয়ার্ক এই কৌশলই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল।
এর ফলে সার্চ ইঞ্জিনেও কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কনটেন্টের উপস্থিতি বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
ডোমেইন দখলের আরেক কৌশল
৫৫০টির বেশি ডোমেইন নিবন্ধনের তথ্যও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
EU DisinfoLab-এর দাবি, এসব ডোমেইনের মধ্যে ছিল—
- এনজিওর নাম
- থিংকট্যাংকের নাম
- সংবাদমাধ্যমের নাম
- ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ
- ধর্মীয় সংগঠন
- প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান
- বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের নাম
এর কিছু ডোমেইন পাকিস্তানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ ‘সাইবারওয়ারফেয়ার’-এর অংশ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নাম দখল করার উদ্দেশ্যেও নিবন্ধিত হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা দাবি করেন।
এটি প্রচলিত সাইবার হামলার চেয়ে ভিন্ন কৌশল—এখানে লক্ষ্য হচ্ছে ডিজিটাল পরিচয় ও তথ্যের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা।
প্রভাব কতটা ছিল?
ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো—এর প্রকৃত প্রভাব কতটা?
EU DisinfoLab-এর তদন্তে বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল—
- ব্রাসেলস ও জেনেভায় বিভিন্ন বিক্ষোভ
- ‘Free Balochistan’ প্রচারণা
- ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিভিন্ন অনুষ্ঠান
- ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভেতরে বিভিন্ন সাপোর্ট গ্রুপ
- ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা
- পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সুইস রাষ্ট্রদূতকে তলবের ঘটনা
- বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও কাশ্মীরে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের বিতর্কিত সফর
তবে এসব ঘটনার প্রতিটির সঙ্গে একই নেটওয়ার্কের প্রত্যক্ষ causal link কতটা শক্তিশালী—তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশও কি এই নেটওয়ার্কের পরিধিতে ছিল?
EU DisinfoLab-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে এসেছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, ভারতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও কাশ্মীরে সফর আয়োজন করেছিল।
তবে বাংলাদেশে এই নেটওয়ার্কের সরাসরি কার্যক্রম, স্থানীয় মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল—এ বিষয়ে প্রদত্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই।
তাই এখানে অতিরিক্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বরং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আলাদা অনুসন্ধানের প্রয়োজন হতে পারে—
কোন ইউরোপীয় এমইপি কখন বাংলাদেশে এসেছেন, কার আমন্ত্রণে এসেছেন, সফরের অর্থায়ন কোথা থেকে এসেছে এবং সফরের পর তাদের বক্তব্য কীভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে।
‘ভারতের স্বার্থে’—কীভাবে?
EU DisinfoLab-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, পুরো নেটওয়ার্কের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল দুই স্তরে কাজ করা।
ভারতের অভ্যন্তরে
ভারতপন্থী এবং পাকিস্তানবিরোধী—এবং কিছু ক্ষেত্রে চীনবিরোধী—জনমত শক্তিশালী করা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
ভারতের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করা, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং EU ও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ভারতের জন্য বেশি সমর্থন তৈরির চেষ্টা করা।
অর্থাৎ, এটি শুধু মিডিয়া প্রোপাগান্ডা নয়; EU DisinfoLab-এর বর্ণনায় এটি ছিল মিডিয়া, এনজিও, লবিং, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল কনটেন্টকে একসঙ্গে ব্যবহার করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারকারী কাঠামো।
তবে পাল্টা বক্তব্যও আছে
অনুসন্ধানটির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা-নৈতিক বিষয় উপেক্ষা করা যাবে না।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর Paulo Casaca, SADF এবং ARCHumankind একটি Right of Reply দেয়। সেখানে EU DisinfoLab-এর কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তোলা হয় এবং তদন্তের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।
এর জবাবে EU DisinfoLab জানায়, তারা তাদের মূল অনুসন্ধানের ফলাফলের ওপর অবস্থান করছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টে সম্পাদকীয় সংশোধন ও ব্যাখ্যাও প্রকাশ করে।
সংস্থাটি আরও দাবি করে, তাদের অনুসন্ধানের ফলাফল BBC, Politico, Les Jours এবং Le Temps-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে যাচাই বা আলোচিত হয়েছে।
তবে এখানেও একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ:
কোনো অনুসন্ধান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত বা আলোচিত হওয়া এবং আদালত বা স্বাধীন তদন্তে প্রতিটি অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া—এক বিষয় নয়।
‘অন্য পক্ষও একই কাজ করে’—EU DisinfoLab-এর সতর্কতা
EU DisinfoLab নিজেই প্রতিবেদনের শেষাংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দিয়েছে।
তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো—এক পক্ষের প্রভাব বিস্তারকারী বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা আছে বলেই অন্য পক্ষের নেই, এমন নয়।
সংস্থাটি স্বীকার করেছে, পাকিস্তানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট inauthentic behaviour নিয়েও অনলাইনে তথ্য পাওয়া যায়।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অনুসন্ধান পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো রায় নয় এবং পাকিস্তানের সংখ্যালঘু আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করাও এর উদ্দেশ্য নয়।
অর্থাৎ, তাদের অনুসন্ধানের মূল দাবি হলো—মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু ইস্যুকে কীভাবে নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হতে পারে, সেই প্রক্রিয়াটি উন্মোচন করা।
কেন ‘Indian Chronicles’ আজও গুরুত্বপূর্ণ?
২০২০ সালের এই তদন্তের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ডিজিটাল বিশ্বে এখন একটি রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় মিডিয়া প্রয়োজন হয় না।
একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়।
একটি পুরোনো এনজিওকে নতুনভাবে চালু করা যায়।
একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্যকে নতুনভাবে প্যাকেজ করা যায়।
একটি সংবাদকে শত শত ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
তারপর সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে সেটিকে ‘জনপ্রিয় মতামত’ হিসেবে হাজির করা যায়।
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি হলো—প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে দেখলে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু সবগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের চিত্র ফুটে উঠতে পারে।
Indian Chronicles তদন্তের মূল শিক্ষা এখানেই।
সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ: যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তে নয়
আজকের ভূরাজনৈতিক লড়াই শুধু সেনাবাহিনী, অস্ত্র কিংবা সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্যও এখন কৌশলগত অস্ত্র।
একটি দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে তৈরি হবে, কোন দেশের বিরুদ্ধে কী ধরনের বয়ান তৈরি হবে, জাতিসংঘের কোনো সভায় কোন ইস্যু আলোচিত হবে কিংবা একজন ইউরোপীয় রাজনীতিকের বক্তব্য কতবার অনলাইনে দেখা যাবে—এসবও এখন প্রভাব বিস্তারের অংশ হতে পারে।
আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে একটি aparentemente নিরপেক্ষ সংবাদ প্রতিবেদন।
তাই পাঠকের জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি আর শুধু—
“খবরটি কোথায় প্রকাশিত হয়েছে?”
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“খবরটির উৎস কে? সেই উৎসের মালিক কে? একই খবর আর কোথায় প্রকাশিত হয়েছে? ওয়েবসাইটটি কত পুরোনো? লেখক বাস্তবে আছেন কি? প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস কী? এবং একই বার্তা কি অন্য শত শত ‘স্বাধীন’ মাধ্যমে একইভাবে ছড়িয়ে পড়ছে?”
এই প্রশ্নগুলো করতে পারলেই ভুয়া তথ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র—বিশ্বাসযোগ্যতার মুখোশ—খসে পড়তে শুরু করে।
সূত্র
EU DisinfoLab, Indian Chronicles: deep dive into a 15-year operation targeting the EU and UN to serve Indian interests, 9 December 2020; সংস্থাটির প্রকাশিত Executive Summary, Full Report এবং Right of Reply-সংক্রান্ত নথি।

