স্মার্টফোনের ডিসপ্লের চারপাশের বেজেল যত পাতলা হয়েছে, ততই বেড়েছে স্ক্রিন-টু-বডি রেশিও এবং ইমারসিভ ভিউয়ের চাহিদা। এবার সেই প্রতিযোগিতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার দাবি করেছে প্রযুক্তি ব্র্যান্ড টেকনো। প্রতিষ্ঠানটি উন্মোচন করেছে নতুন প্রজন্মের একটি বেজেলবিহীন কনসেপ্ট ফোন, যেখানে কোম্পানির দাবি—ডিসপ্লের দৃশ্যমান বেজেল ০ মিমি।
অর্থাৎ ফোনের সামনে থেকে তাকালে প্রচলিত স্মার্টফোনের মতো আলাদা কালো বর্ডারের উপস্থিতি প্রায় নেই। এর ফলে পুরো সামনের অংশজুড়ে আরও বেশি স্ক্রিন স্পেস এবং তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ডিজাইনের অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে টেকনো।
তবে এটি এখনো বাজারে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত কোনো স্মার্টফোন নয়। বরং ভবিষ্যতের স্মার্টফোন কেমন হতে পারে, সেই ধারণার একটি প্রদর্শনী হিসেবে কনসেপ্ট ডিভাইসটি সামনে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বেজেল কমানোর লড়াই এবার শূন্যে?
স্মার্টফোন নির্মাতারা দীর্ঘদিন ধরেই ডিসপ্লের চারপাশের বর্ডার ছোট করার চেষ্টা করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ফোনের সামগ্রিক আকার খুব বেশি না বাড়িয়ে ব্যবহারকারীদের সামনে আরও বড় ডিসপ্লে তুলে ধরা।
একসময় মোটা বেজেল ছিল প্রায় সব স্মার্টফোনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। পরে পাতলা বেজেল, নচ, পাঞ্চ-হোল এবং কার্ভড ডিসপ্লের মাধ্যমে নির্মাতারা স্ক্রিনের ব্যবহারযোগ্য জায়গা বাড়াতে থাকে।
টেকনোর নতুন কনসেপ্ট সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও সামনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে শুধু স্ক্রিনের বর্ডার পাতলা করার বদলে দৃশ্যমান বেজেলকে প্রায় সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়ার ধারণা সামনে আনা হয়েছে।
কীভাবে সম্ভব হলো ০ মিমি বেজেল?
একটি স্মার্টফোনের ডিসপ্লের চারপাশে জায়গা রাখা হয় বিভিন্ন কম্পোনেন্ট, ডিসপ্লে স্ট্রাকচার এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অংশের জন্য। ফলে স্ক্রিনকে একেবারে ডিভাইসের প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রকৌশলগতভাবে সহজ নয়।
টেকনোর কনসেপ্টে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে অভ্যন্তরীণ কম্পোনেন্টের বিন্যাস, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিসপ্লে প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর লক্ষ্য হলো ফোনের আকার অপরিবর্তিত রেখেও সামনের অংশে আরও বেশি ডিসপ্লে জায়গা তৈরি করা।
ফলে প্রচলিত বেজেলযুক্ত ফোনের তুলনায় কনসেপ্ট ডিভাইসটির সামনে থেকে স্ক্রিনের উপস্থিতি আরও বেশি চোখে পড়বে।
কার্ভড স্ক্রিনের বদলে বেজেল কমানোর ওপর জোর
বর্তমানে বড় ডিসপ্লে ও ইমারসিভ ভিউ দেওয়ার জন্য অনেক স্মার্টফোনে কার্ভড এজ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু টেকনোর এই কনসেপ্টে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্ক্রিনের প্রান্তকে যতটা সম্ভব সরাসরি সামনে এনে দৃশ্যমান বর্ডার কমানোর ওপর।
এর ফলে ডিসপ্লের চারপাশের জায়গা কমিয়ে একটি তুলনামূলক ক্লিন ও অল-স্ক্রিন ডিজাইন তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভিডিও দেখা, গেম খেলা, ছবি ব্রাউজ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট দেখার সময় এই ধরনের ডিজাইন ব্যবহারকারীর দৃষ্টিতে আরও বেশি ইমারসিভ অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, বদলাতে পারে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাও
০ মিমি বেজেলের ধারণাটি শুধু দেখতে আকর্ষণীয় করার জন্য নয়। ডিসপ্লের চারপাশের অতিরিক্ত জায়গা কমানো গেলে একই আকারের ডিভাইসে আরও বড় কার্যকর স্ক্রিন পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
বিশেষ করে সিনেমা, ভিডিও, গেমিং ও ছবি দেখার ক্ষেত্রে স্ক্রিনের চারপাশে কম দৃশ্যমান বাধা থাকলে কনটেন্টের প্রতি মনোযোগ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ছোট আকারের ফোনে তুলনামূলক বড় ডিসপ্লে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে স্মার্টফোনের ডিজাইনেও পরিবর্তন আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মহলেও নজর
টেকনোর এই কনসেপ্ট ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে। Digital Trends কনসেপ্টটির বেজেলবিহীন ডিজাইন নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। অন্যদিকে GSMArena টেকনোর ০ মিমি ডিসপ্লে বেজেলের দাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।
এতে বোঝা যায়, স্মার্টফোনের ডিসপ্লের চারপাশের বেজেল কমানোর প্রতিযোগিতা এখনো নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্র।
সেপ্টেম্বরে আরও তথ্য মিলতে পারে
টেকনোর এই ভবিষ্যৎমুখী কনসেপ্ট ডিভাইসটি IFA 2026-এ প্রদর্শিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য এই প্রযুক্তি প্রদর্শনীতে ডিভাইসটির প্রযুক্তি, ডিজাইন ও প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
তবে এখনই এটিকে বাজারে আসতে যাওয়া কোনো নির্দিষ্ট স্মার্টফোন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কনসেপ্ট ফোনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতের ডিভাইস সম্পর্কে কী ধরনের ধারণা নিয়ে কাজ করছে, সেটি তুলে ধরা।
বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য এর অর্থ কী?
বাংলাদেশের বাজারে এই নির্দিষ্ট কনসেপ্ট ফোনটি কবে বা আদৌ বিক্রি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এর প্রযুক্তিগত ধারণা ভবিষ্যতের স্মার্টফোনে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত দিতে পারে।
একই আকারের ফোনে আরও বড় ভিউয়িং এরিয়া, আরও পরিষ্কার ফ্রন্ট ডিজাইন এবং ইমারসিভ ডিসপ্লে—এসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের সাধারণ স্মার্টফোনেও দেখা যেতে পারে।
০ মিমি বেজেল কি সত্যিই পরবর্তী বড় পরিবর্তন?
স্মার্টফোন ডিজাইনের ইতিহাসে প্রতিটি ধাপে নির্মাতারা স্ক্রিনকে ডিভাইসের প্রান্তের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। নচ থেকে পাঞ্চ-হোল, তারপর পাতলা বেজেল—প্রতিটি ধাপের লক্ষ্য ছিল একই: ব্যবহারকারীর সামনে যত বেশি সম্ভব ডিসপ্লে তুলে ধরা।
টেকনোর ০ মিমি বেজেল কনসেপ্ট সেই ধারারই আরও উচ্চাভিলাষী একটি পদক্ষেপ।
এখন দেখার বিষয়, কনসেপ্ট পর্যায়ের এই প্রযুক্তি কতটা দ্রুত বাস্তব পণ্যে রূপ নেয় এবং বাস্তব ব্যবহারে এর স্থায়িত্ব, খরচ ও প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতাগুলো কীভাবে সমাধান করা হয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—স্মার্টফোনের ভবিষ্যৎ যে আরও বেশি স্ক্রিন, কম বর্ডার এবং আরও ইমারসিভ অভিজ্ঞতার দিকে এগোচ্ছে, টেকনোর নতুন কনসেপ্ট সেই ভবিষ্যতেরই একটি সম্ভাব্য ছবি তুলে ধরেছে।

