কল্পনা করুন, এমন একটি স্কুল যেখানে কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আর শ্রেণিকক্ষে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের বলা হয় “গাইড”—যাদের কাজ পড়ানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া। এমনই একটি শিক্ষা মডেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে Alpha School।
টেক্সাস থেকে যাত্রা শুরু করা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি অঙ্গরাজ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আগামী ১২ আগস্ট ওকলাহোমায় আরও দুটি নতুন ক্যাম্পাস চালুর ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে শুধু এর ব্যতিক্রমী শিক্ষা পদ্ধতিই নয়, আলোচনায় রয়েছে এর ব্যয়বহুল টিউশন ফিও। বছরে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৯ লাখ টাকা। স্থানীয় অনেক নামকরা বেসরকারি স্কুলের তুলনায়ও এই ফি কয়েক গুণ বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা (Financial Aid) দেয় না।
মাত্র ২ ঘণ্টা একাডেমিক পড়াশোনা
Alpha School-এর শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত স্কুলগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা মাত্র দুই ঘণ্টা একাডেমিক বিষয় পড়ে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য থাকে প্রায় আধা ঘণ্টার সেশন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় এআই-নির্ভর অ্যাডাপটিভ লার্নিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে।
দিনের বাকি সময় ব্যয় করা হয় বাস্তব জীবনের দক্ষতা উন্নয়নে। এর মধ্যে রয়েছে—
- আর্থিক শিক্ষা (Financial Literacy)
- পাবলিক স্পিকিং
- নেতৃত্ব (Leadership)
- টিমওয়ার্ক
- সমস্যা সমাধানসহ বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম
প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাকেঞ্জি প্রাইস বলেন, “আমরা মানুষের বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর জন্য এআই ব্যবহার করছি।”
শিক্ষক নয়, ‘গাইড’
Alpha School-এ প্রচলিত অর্থে কোনো শিক্ষক নেই। শ্রেণিকক্ষে যারা থাকেন, তাদের পরিচয় Guide হিসেবে।
তাদের শিক্ষকতার সনদ থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তারা পাঠদান করেন না; বরং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, উৎসাহ দেওয়া এবং মানসিক সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন।
এআই নয়, অ্যাডাপটিভ লার্নিং
Alpha School-এর ব্যবহৃত প্রযুক্তিকে অনেকেই ChatGPT-এর মতো চ্যাটবট মনে করলেও বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
এটি মূলত Adaptive Learning Software, যা শিক্ষার্থীর শেখার গতি অনুযায়ী পাঠ পরিবর্তন করে।
কোনো শিক্ষার্থী ভুল উত্তর দিলে সিস্টেম অপেক্ষাকৃত সহজ প্রশ্নে ফিরে যায়। আবার সঠিক উত্তর দিলে ধীরে ধীরে কঠিন স্তরে উন্নীত হয়। ফলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী এগোতে পারে, পুরো ক্লাসের গড় গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নয়।
এ ধরনের প্রযুক্তি Khan Academy, IXL-এর মতো প্ল্যাটফর্মেও ব্যবহৃত হয়।
প্রশংসার পাশাপাশি উঠছে প্রশ্নও
Alpha School-এর শিক্ষা মডেল নিয়ে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে নানা বিতর্কও।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার আইনপ্রণেতা সিন্ডি মানসন এই মডেল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে—
- এআই কারিকুলামে ভুল তথ্য (AI Hallucination) পাওয়া গেছে।
- কিছু কুইজে এমন প্রশ্ন ছিল, যার সঠিক উত্তর দেওয়াই সম্ভব নয়।
- শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও ছবি সংগ্রহের কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- অন্য প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ব্যবহার করে নিজস্ব এআই তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে, যদিও এ অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি।
অন্যদিকে, পেনসিলভানিয়া শিক্ষা বিভাগ এই শিক্ষা মডেলকে “Untested” বা এখনো পর্যাপ্তভাবে পরীক্ষিত নয় বলে উল্লেখ করেছে।
স্বাধীন গবেষণায় এখনো প্রমাণিত নয়
Alpha School দাবি করে, তাদের শিক্ষার্থীরা মাত্র দুই ঘণ্টায় প্রচলিত স্কুলের তুলনায় দ্রুত শেখে।
তবে এই দাবি মূলত প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। এখন পর্যন্ত স্বাধীন গবেষণায় এর কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির সাইবার-চার্টার স্কুল চালুর আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এআই কখনোই শিক্ষকের পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
অ্যাডাপটিভ লার্নিং সফটওয়্যার গণিত শেখাতে পারে, কুইজ তৈরি করতে পারে কিংবা শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী কেন শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, কেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে উৎসাহের প্রয়োজন—এসব বোঝার ক্ষেত্রে এখনো মানুষের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশেও Khan Academy, NotebookLM, Gemini-এর মতো বিনামূল্যের এআইভিত্তিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে শেখার গতি বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশ্লেষকেরা।
ডিজিট২৪ বিশ্লেষণ
শিক্ষাক্ষেত্রে এআই নিঃসন্দেহে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। তবে শিক্ষককে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে কেবল প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং শিশুদের মানসিক বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও নীতিমালা প্রয়োজন। বর্তমান বাস্তবতায় এআইকে শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং একজন দক্ষ শিক্ষকের শক্তিশালী সহকারী হিসেবেই দেখছেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ।

